ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক এর সরকারি বাসভবনের সীমানা প্রাচীরে আঁকা রক্তাক্ত জুলাই আগষ্ট চেতনার গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়েছে।
গত ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করার পর বিপ্লবী চেতনা ধরে রাখতে শিক্ষার্থীরা সারাদেশের মত ময়মনসিংহ নগরীর বাসা বাড়ি,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি বেসরকারি অফিস ও আদালতসহ জেলা প্রশাসকের সরকারি বাসভবনের দেয়ালজুড়ে জুলাই-আগষ্ট চেতনার গ্রাফিতি অঙ্কন করা হয়েছিল। বিপ্লবী শিক্ষার্থীদের আঁকা সেই রক্তাক্ত জুলাই আগষ্ট চেতনার গ্রাফিতি মুছে ফেলে নতুন করে সীমানা দেয়াল রঙ করা হয়েছে জেলা প্রশাসকের সরকারি বাসভবন।
জানা যায়,১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে জেলা প্রশাসকের বাসভবনের সম্পূর্ণ দেয়ালের কাজ পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাহবুব এন্টারপ্রাইজ। জেলা প্রশাসকের বাসভবনের আগের দেয়াল আরও কয়েকফুট উচু করতে,পুরো দেয়ালে রঙ করতে,দেয়ালের উপরে কাঁটাতার লাগানোসহ আরও কিছু আনুষঙ্গিক কাজের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাহবুব এন্টারপ্রাইজ কাজ পেয়েছে।
আগের দেয়ালের ওপর কোনো অংশে দুই ফুট, আবার কোনো অংশে তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট পর্যন্ত উচু করা হয়েছে। এরপর নতুন রঙ লাগানো হয়েছে। দেয়ালের ওপর কাটাতার লাগানো হবে। এরপর হবে হবে লাইটিং। ঠিকাদার লোকের মাধ্যমে নতুন দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকবে এমন কোনো চুক্তি হয়নি বলে জানান তারা। সৌন্দর্যবৃদ্ধি আর নিরাপত্তার স্বার্থেই দেয়াল উঁচু করে নতুন রঙ লাগানো হয়েছে বলে জানান তারা।
ঠিকাদার মাহবুব রেজা করিমের ক্যাশিয়ার নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, জেলা প্রশাসকের বাসভবনের সম্পূর্ণ দেয়াল এক হাজার ৮০০ ফুট। এর মধ্যে ৩০০ ফুটে কাঁটাতার দেবে ঠিকাদার। দেয়ালের সব কাজ শেষ হতে আরও বেশ কিছুদিন সময় লাগতে পারে। এছাড়া বৈদ্যুতিক কাজগুলো করবে অন্য ঠিকাদার।
রক্তাক্ত জুলাইয়ের গ্রাফিতি মুছে নতুন রঙ লাগানোর বিষয়টি নগরবাসীর অনেকের নজরে এসেছে। এতে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে ফুঁসছেন তারা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ বৈষম্য বরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া লোকজনও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিায়া জানিয়েছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ময়মনসিংহের সাবেক সমন্বয়ক গকূল সূত্রধর মানিক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জুলাই-আগস্টের প্রতিচ্ছবি শিক্ষার্থীরা দেয়ালে ফুটিয়ে তুলেছিল। জেলা প্রশাসনের মধ্যে কোন পরিবর্তন হয়নি। তারা ফ্যাসিস্ট হাসিনার সময়ে যেমন ছিল,তেমনই আছে এখনো। গ্রাফিতি মুছে দেয়ায় এটাই প্রমাণিত হয়েছে। আমলাতন্ত্র জুলাই আন্দোলনেও অভ্যুত্থানবিরোধী ছিল, এখনও তাই আছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি উত্তরাঞ্চলের সংগঠক ও এনসিপি ময়মনসিংহ জেলা সমন্বয় কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবুল বাশার গ্রাফিতি মুছে ফেলার ঘটনায় নিন্দা করে জানান, যারা জুলাই স্পিরিট ধারণ করে না তারা ফ্যাসিষ্টের দোসর। কাজেই রক্তাক্ত জুলাই আগষ্ট চেতনার গ্রাফিতি ফেলা তাদের জন্য কোন বিষয় নয়।
ময়মনসিংহ জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, জুলাই-আগষ্ট বিপ্লবের পর দেয়ালের গ্রাফিতি ছিল রক্তাক্ত বিপ্লবকে উজ্জীবিত রাখার প্রতিক। এটি মুছে ফেলা কোনভাবেই কাম্য ও গ্রহনযোগ্য নয়।
ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান সরকার রোকন এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, শিক্ষার্থীদের আকা দেয়ালের গ্রাফিতি রক্তাক্ত জুলাই-আগষ্ট চেতনাকে ধারন করছে। জেলা প্রশাসক কেন এই গ্রাফিতি মুছে ফেলেছেন তার ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সাথে এ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন ছিল বলেও তিনি মত দেন।
ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট এএইচএম খালেকুজ্জামান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, রক্তাক্ত জুলাই আগষ্ট চেতনার গ্রাফিতি মুছে ফেলা দুঃখজনক। এটি জুলাই যোদ্ধাদের অবমাননার শামিল।
জেলা প্রশাসনের এনডিসি সাইফুল্লাহিল গালিব জানান, জেলা প্রশাসকের বাসভবনে সীমানা প্রাচীরের দেয়ালে কিছু সংস্কারকাজ চলছে। সংস্কারকাজ শেষে আবারও ২৪-এর আদর্শ ধারণ করা গ্রাফিতি আঁকানো হবে।
এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলম বলেন, পুরনো দেয়ালের গ্রাফিতি মুছে ফেলা হলেও নতুন করে করা হবে।
এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন জুলাই-আগষ্ট অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীসহ ময়মনসিংহের স্থানীয় রাজনীতিবিদসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। তারা বলছেন এটি জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি অবমাননার শামিল।
Leave a Reply