আশির দশকে নয় বছরের আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় লাভ করে ক্ষমতায় আরোহনের সরব সাক্ষী সাংবাদিক আমি ২০০৯ সালের জানুয়ারী মাসে ঢাকায় একটি বিদেশী মিশনের রিসিপশনে আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত হই। সৌজন্যে বিনিময়ের এক পর্যায়ে ক্ষমতাশীন দলের এক নেতা কথা আছে বলে কাছে ডেকে বেশ খানিকক্ষণ আমার ডান হাতে ধরে রাখেন। একে একে অন্য দলের নেতারা এসে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। আমিও জবাব দিচ্ছি। কিন্তু উক্ত নেতা কিছুতেই আমা্র হাত ছাড়ছেন না। কি একটা অস্বস্তিকর ব্যাপার। তার সাথে রাস্তার আন্দোলনে অনেক দিনের সম্পর্ক। এর আগের মেয়াদে যখন তার দল ক্ষমতায় আসে তখন তিনি মন্ত্রী ছিলেন। সাক্ষাতে বা মোবাইলে তাতক্ষনিক ভাবে কথা বলতেন। ফখরুদদিন-মঈনুদদিনদের শাসন কালে তিনি নির্যাতিত হয়ে কারাগারে বেশ কিছু দিন অসুস্থ ছিলেন।
অবশেষে কি তিনি আমার হাত ছেড়ে দিলেন। মনে হল আমাকে কারো দৃষ্টিতে আনা তার উদ্দেশ্য ছিল। রিসিপশনে অতিথি ছিলেন উত্তর প্রদেশের কংগ্রেস নেতা ও তখনকার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সালমান খুরশিদ। তার সাথে দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে পরিচয় হয়েছিল। কাছে ঘেঁষতেই বোঝা গেল সেদেশের নিরাপত্তা কর্মিরা এটা সহজভাবে নিচ্ছেনা। আপাত দৃষ্টিতে মামুলী দুটা বাক্য বিনিময় করে অন্যদিকে গেলাম, খাওয়া দাওয়ায় মননিবেশ করলাম। তখন হাই কমিশানার ছিলেন দ্বিপংকর চক্রবর্ত্তী। ছিলেন উড়িষ্যার অধিবাসি এক মিনিষ্টার। উভয়ের সাথে আমার ভাল পরিচয় ছিল। এক-এগারোর পরিবর্তনের পর এখানেই অনুষ্ঠিত সে বছরের রিসিপশনে উক্ত মিনিস্টার মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারের সাথে সহযোগিতার করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
২০০৯-এর রিসিপশনে আসার আগে দুটি ঘটনা ঘটে। মুঠোফোনের এক ক্ষুদে বার্তায় একটা হুমকি আসে। ইংরেজিতে লেখা যার ভাষা ছিল অত্যন্ত উচুমানের। কিন্তু বার্তাটা ছিল কর্কশ ও ভীতিকর। ‘একটা সাদা পাখি আকাশে উড়ছিল। তখন একজন বন্দুকধারী পাখিটাকে গুলি করল। এবং একটা সাদা গোলাপ লাল গোলাপে পরিনত হল।’ কেন এই হুমকি? আমি তখন ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশনের সম্পাদক। পত্রিকাটা আমার নেতৃত্বে ভালই করছিল। সার্কুলেশন এবং আয় উভয়ই বাড়ছিল। লোকসানি অবস্থা কেটে গিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বি হয়ে উঠছিল নিউ নেশন। সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি ব্যারিষ্টার মঈনুল হোসেন ও রোববার গ্রুপের চেয়ারম্যান ম্যাডাম সাজু হোসেনের সহযোগিতায় কাজের পরিবেশও ভাল ছিল। তবে যারা ২০০৮-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হন তাদের প্রিয় ভাজন আমি ছিলাম না।
দ্বিতীয় ঘটনাটা ছিল আরো ভয়ংকর। অফিসের কাজ সেরে রাত বারোটার পর মতিঝিল বানিজ্যিক এলাকা থেকে মিরপুর সাংবাদিক আবাসিক এলাকায় ফেরার পথে আমার গাড়ির উপর আক্রমণ করা হয়। আমি নিজে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। মিরপুর পূরবী সিনেমা হলের কাছে গিয়ে ডান দিকে মোড় নেয়ার পূর্ব মূহুর্তে আমার গাড়ির পেছন দিকে অন্য একটা গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দেয়া হয়। আমি অত্যন্ত ধীরস্থির ভাবে ড্রাইভ করি। হঠাৎ ব্রেক করিনি যে পেছনের গাড়িওয়ালা গতিবেগ সামলাতে না পেরে আমার গাড়ির সাথে লাগিয়ে দিয়েছে।
ভাবলাম গাড়ি থেকে নেমে একটা বোঝাপড়া করি। পরক্ষণে মনে পড়ল রাত তখন সাড়ে বারটা। আর আমি একা। এ অবস্থায় সাংবাদিকের বীরত্ব দেখানো সমিচিন হবেনা। যা হবার হয়েছে, চলে যাই। কিন্তু যেমনি গাড়ি সামনে বাড়ালাম তেমনি দেখি দুই ব্যাক্তি সামনে এসে দাড়াল দাঁড়াল। আমি বুঝলাম আক্রমণটা পরিকল্পিত। আমি সামরিক ট্রেনিংপ্রাপ্ত মানুষ। ১৯৭১-এর মার্চে এমএনএ আব্দুল আউয়ালের নেতৃত্বে চাঁদপুরের কচুয়া পাইলট হাই স্কুল মাঠে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং দেই। মনে মনে ঠিক করলাম যা হয় হবে আমি সোজা তাদের উপর দিয়ে গাড়ি টান দেব। এবং তাই করলাম। সামনে দাঁড়ানো দুই লোক দুপাশে সরে গেল। তাদের একজন স্টীলের একটা ফোল্ডিং চেয়ার দিয়ে গাড়ির উইন্ডস্ক্রীনে সজোরে আঘাত করল। লেমিনেট করা উইন্ডস্ক্রীন ভেংগে গুড়ো হয়ে ঝুলে গেল। গাড়ি যেহেতু চলছিল, লোকটা ফোল্ডিং চেয়ার দিয়ে আরেকটা আঘাত করল। তাতে পেছনের সিটের বাম পাশের কাচের স্ক্রীন ভেংগে গুড়ো হয়ে সিটের উপর পড়ল। আমার গায়ে কোন আঘাত লাগেনি। আমি ভাংগা গাড়ি চালিয়ে চলে গেলাম। বিষয়টা সাংবাদিক আবাসিক এলাকার প্রধান দারোয়ান ফারুকের দৃষ্টি এড়ায়নি। সে আমার বাসা পর্যন্ত হেঁটে এসে তার প্রতিক্রিয়া জানাল। পরের দিন মেকানিক শেখ আনিসুর রহমান জানাল গাড়ির পেছনের দুচাকা ফুটো। হয় ধারালো চাকু দিয়ে কোপ মারা হয়েছে নাহয় গুলি করা হয়েছে। সে আরো জানাল, আমার ভাগ্য ভালো, চাকাগুলো টিউব বিহীন হওয়ায় চালিয়ে যেতে পেরেছি। নাহয় টিউবের কারণে গাড়ি ডানে-বায়ে ঝাকড়াতো এবং আক্রমণকারিরা আমাকে ধরে ফেলতে পারতো।
কিন্তু কেন এই আক্রমণ? কেন এই হুমকি? পরে যারা বিষয়টা জেনেছেন, তাদের কেউ কেউ বলেছেন, এটি ছিল গুম-খুনের আক্রমণের একটা মডেল। যা অন্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়েছে। আমি আমার কাছের লোকদের পরামর্শে তখন থেকে কার নিয়ে প্রত্যেকদিন ভিন্নপথ ধরে চলতাম।
মুঠোফোনে হুমকি বা হুশিয়ারি বার্তা পাঠানো কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হয়। একই বছরের মে মাস থেকে। এক বার্তায় বলা হয়, ‘এটা আসলেই কষ্টকর যে সিনিয়র কিছু আর্মি অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু এরকম কার্যকলাপ বিএনপি আমলেই শুরু হয়েছিল।’ কয়েকজন অবসরে যাওয়া অফিসারের নাম উল্লেখ করে বার্তায় বলা হয় তাদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছিল। ইংরেজিতে পাঠানো বার্তার শেষাংশে হুমকি দিয়ে বলা হয়, অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকবেন।
পরের ক্ষুদে বার্তাটা আসে বাংলা ভাষায়, কিন্তু ইংরেজি ফন্টে লেখা। এটাতে কোন মার্জিত ভাব ছিলনা। সরাসরি গালমন্দ। জানা গেছে এ বার্তাটা অনেকের কাছে পাঠানো হয়েছিল। দৈনিক দিনকালের তখনকার সম্পাদক আমানুল্লাহ কবির (বর্তমানে স্বর্গীয়) তার কাছে পাঠানো এ বার্তা কিছুটা সম্পাদনা করে পত্রিকায় ছাপিয়ে দিয়েছিলেন।
বার্তার শুরুটা ছিল এরকম, ‘শালা রাজাকারের বাচ্চারা। জাতীয়তাবাদ ….. । …….. পাকিস্তান পাঠিয়ে দেব।’
এসব ক্ষুদে বার্তার হুমকিগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বার্তার প্রেরকরা তাদের টার্গেট আগে থেকেই ঠিক করে রেখে ভিন্নমতের সাংবাদিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থেকে বিচ্যুত করার প্রয়াস পেয়েছেন। এসব উদ্যোগের আরেকটা ধাপ ছিল। টার্গেট সাংবাদিকদের কাছে আসা সব ইমেইল স্ক্যান করা হতো, কোন রাখঢাক না করেই। যে এমেইলগুলো স্ক্যান করা হতো সেগুলোকে (ডিজ-আর্মড) লিখে চিহ্নিত করে রাখা হত।
আরেকটি ঘটনার উল্লেখ না করলে সাংবাদিক নির্যাতনের যে নমুনা আমি দেখেছি তার উপর লেখা এ প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তখনকার ডিজিএফআই, ঢাকা সিটি ওয়িং থেকে দুই ইন্সপেক্টর পাঠিয়ে আমাকে সেখানে দেখা করতে বলা হয়। কি কারণ তার কিছু না জানিয়ে তারা চলে যান। আমি নির্দিষ্ট দিন ও সময়ে সেখানে যাই। একজন লেঃ কর্ণেল-এর নেতৃত্বে কিছু লোক আমার সাথে কথা বলেন। মিরপুরস্থ সাংবাদিক আবাসিক এলাকায় ডিস ব্যবসায়িদের তাদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে দেবার জন্য তারা আমাকে বলেন। আমি তখন এই আবাসিক এলাকার সভাপতি এবং দৈনিক নিউ নেশনের সম্পাদক। সামিরিক বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্টতার সুযোগে ডিস ব্যবসায়িরা ১/১১ পরিবর্তনের পর অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। এক দশকেরও বেশী সময় ধরে উক্ত এলাকায় ব্যবসায় করার বিনিময়ে তারা সমিতিকে প্রতি মাসে কিছু রয়াল্টি প্রদান করত। আমি রয়াল্টি বাড়াবার কথা বললে তারা আমাকে বলেন, কিসের চাঁদা। তার বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নিবেন। তখনকার ১/১১-পরবর্তী কেয়ারটেকার সরকারের কাছে চাঁদাবাজি একটা বড় অপরাধ বলে বিবেচিত হতো। ডিজিএফআই-এ সেই বৈঠকে আমি জবাবে বলি সাংবাদিক আবাসিক এলাকার সমিতি একটা আইনানুগ স্বত্বা। তার অধিকার খর্ব করা ঠিক হবে না। উপস্থিত শশ্রুমন্ডিত একজন মেজর তার নাক এক বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে উঁচু করে ধরে বলে ওঠেন, ‘ওনার নাকটা একটু উঁচা’। জানতে পারলাম ওটা ছিল যৌথ বাহিনীর বৈঠক। অন্যান্যদের মধ্যে একজন নাদুস্ -নুদুস সহকারী পুলিশ কমিশনারও ছিলেন। আমাকে পরে আরেক দিন আসতে বললেন লে কর্নেল সাহেব। জবাবে আমি বললাম, আমাদের কমিটির ১২ জন সদস্য নিয়ে আসব। তিনি বললেন আপনি আসলেই হবে।
পরে নির্দিষ্ট দিনে আমি সাংবাদিক গৃহসংস্থান সমবায় সমিতির পাঁচজন নির্বাহী-কমিটি সদস্যকে সাথে নিয়ে কচুক্ষেত মার্কেটের কাছে গিয়ে লে কর্ণেল সাহেবকে মোবাইলে জানাই আমরা এসেছি। জববে উনি বলেন অতজন কেন। আসা লাগবেনা। আমরা ঠিক করলাম অতদূর যখন এসেই গেছি, দেখা করে যাই। কিন্তু কর্ণেল সাহেব দেখা করলেন না। লিফট দিয়ে নামার সময় এক দৃশ্য দেখে আমরা হতবাক হয়ে গেলাম। ডিস ব্যবসায়িদের সাথে স্যুট-টাই পরিহিত আমাদের আবাসিক এলাকার এক সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ডিসের ব্যবসায়িরা তার বাসার নীচ তলার ভাড়াটিয়া। আমরা তাকে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করলামনা। আমাদের বৈঠক বাতিল হবার পর জেনেছি, জনৈক সিনিয়র অফিসার লে কর্ণেল সাহেবের কাছে জানতে চেয়েছেন কেন একজন পত্রিকা সম্পাদককে বারবার ডেকে পাঠানো হচ্ছে। তিনি বলে দেন আজকে যদি উনি আসেন তাহলে তাকে নিয়ে আর বৈঠক নাকরে সরাসরি আমার কাছে নিয়ে আসবে। অসুস্থতার অযুহাতে লে কর্ণেল সাহেব সে নির্দেশ এড়িয়ে যান। আমরা সেই সিনিয়র অফিসার, জনৈক কর্ণেলের কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু তার সিনিয়র জনৈক ব্রিগেডিয়ার জেনেরেল সূচনা পর্বে জ্ঞাত হয়েও আমাকে লে কর্ণেল সাহেবের আহবানে সাড়া দিয়ে দেখা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
সে যাক। নিউ নেশনে কিছু সংবাদ ছাপা হবার কারণেও আমাকে ডিজিএফআই-এ ডেকে পাঠানো হয়েছিল। কিছু জুনিয়র অফিসার দিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেখানে প্রথমে নিউ নেশনের সংশ্লিষ্ট কপি আমাকে দেখিয়া জিজ্ঞেস করা হয় কেন এ নিউজ ছেপেছেন। আমার সেদিনটা তারা মাটি করে দেন অনেকক্ষণ সময় ক্ষেপন করে। যখন বেরিয়ে আসি তখন ক্ষুদায় পেট চো-চো করছিল।
এতো বিড়ম্বনা ও নির্যাতনেও যারা স্বাধীন মতপ্রকাশের পথ ছাড়েননি, তাদের পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ার মালিকদের সাথে দেন দরবার করে চাকুরিচ্যুত করা হয়। অনেককে গ্রেপ্তার এবং কিছু সাংবাদিককে গুম পর্যন্ত করা হয়। ফ্যাসিস্ট আমলে নিহত হন ৫৫ অধিক সাংবাদিক। এমন কঠিন সময় যেন বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জীবনে আর না আসে। এ কামনাই করি।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
Leave a Reply