গভীর সংকটের মুখোমুখি জাতি বর্তমান বিশ্বে উন্নত ও প্রথম বিশ্বের দেশগুলো যখন আধুনিক ও ভয়ংকর বিধ্বংসী অস্ত্র সংযোজনের মাধ্যমে নিজেদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রদর্শনে ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশ লড়াই করছে আরও মৌলিক ও মানবিক সমস্যার সঙ্গে—কর্মসংস্থান, জীবনধারণ, দারিদ্র্য এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের এক শ্রেণির নামমাত্র নেতৃত্ব আজ দেশপ্রেমের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তারা নির্বিঘ্নে সম্পদ বিদেশে স্থানান্তরে ব্যস্ত, অথচ দেশের অর্থনীতি ও জনগণের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এরই পরিণতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সমুদ্রের ফেনার মতো—ভাসমান, দুর্বল এবং যে কোনো সময় বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও তার প্রশাসনিক কাঠামো এখনো সেই পরিপক্বতায় পৌঁছাতে পারেনি, যা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তর—মন্ত্রণালয়, সচিবালয়, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর এবং মাঠ প্রশাসন—কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের কারণে সচিব ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রেই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের তুলনায় অধিক দক্ষ ও অভিজ্ঞ। এই অভিজ্ঞতার ব্যবধান থেকেই উপদেষ্টা পরিষদ ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং নীতিগত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মূলত শাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাবেরই প্রতিফলন।
গত দেড় বছরে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও নগদ অর্থপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ভারসাম্য হারিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নীতি সহায়তা, দিকনির্দেশনা ও আস্থার সংকেত না পাওয়ায় ব্যবসায়ী সমাজ বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছে। ফলে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক চক্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, শিল্প ও উৎপাদন খাত স্থবির হয়ে পড়ছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে দ্রুত জাতীয় নির্বাচন আয়োজন এখন আর কেবল একটি রাজনৈতিক দাবি নয়—এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর বিলম্বিত হলে অন্তর্বর্তী সরকারের এই সময়কালের ক্ষতি আগামী ৩০ বছরেও পূরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। এর পরিণতিতে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অরাজকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
এই মুহূর্তে দেশটির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো সিদ্ধান্তহীনতা থেকে বেরিয়ে আসা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়া। আর সেই সমাধানের একমাত্র গণতান্ত্রিক ও টেকসই পথ হলো—জনগণের রায়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর।
মোহাম্মদ আরিফ হোসেন
সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজ–অর্থনীতি বিশ্লেষক
Leave a Reply