মোহাম্মদ আরিফ হোসাইন: একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা শুধু ক্ষমতা গ্রহণে নয়, বরং ক্ষমতা ব্যবহার ও ত্যাগের সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামা—টানা ২৪ বছর দেশ শাসন করেছেন। তাদের রাজনৈতিক দর্শন, দলীয় অবস্থান ও নীতিতে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে তারা অভিন্ন—রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা ও সাংবিধানিক শৃঙ্খলা রক্ষা।
আজ তারা কেউ ক্ষমতায় নেই, তবুও সম্মানিত। একসঙ্গে বসে কথা বলেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। প্রশ্ন জাগে—কেন তারা গ্রহণযোগ্য, আর আমরা কোথায় পিছিয়ে? নীতিতে ভিন্নতা, নৈতিকতায় ঐক্য বিল ক্লিনটন অর্থনীতি-কেন্দ্রিক বাস্তববাদী নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাজেট ঘাটতি কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল তার মূল লক্ষ্য। ব্যক্তিগত বিতর্ক সত্ত্বেও তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেননি, তদন্তকে বাধা দেননি। জর্জ ডব্লিউ বুশ ছিলেন রক্ষণশীল ও সিদ্ধান্তপ্রবণ। ৯/১১-এর মতো সংকট মোকাবিলায় তার কিছু সিদ্ধান্ত বিতর্কিত হলেও তিনি কখনো বিচার বিভাগ বা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেননি। ক্ষমতা ছাড়ার পর তিনি উত্তরসূরিকে অসম্মান করেননি। বারাক ওবামা আইনের শাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রতীক। তিনি জানতেন—রাষ্ট্র পরিচালনায় ভাষণের চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধীদের দমন নয়, সহাবস্থানই ছিল তার কৌশল। তিনজনের মিল ছিল এক জায়গায়—ক্ষমতা তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল না।
বিশ্ব নেতৃত্বে গ্রহণযোগ্যতার কারণ;
বিশ্ব রাজনীতিতে নেতৃত্ব শুধু শক্তি দিয়ে আসে না; আসে বিশ্বাস থেকে। এই তিন প্রেসিডেন্টের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে—নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি আদালত স্বাধীন ছিল গণমাধ্যম ছিল কঠোর কিন্তু মুক্ত বিরোধী দল ছিল সক্রিয় ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল শান্তিপূর্ণ এ কারণেই ক্ষমতার বাইরে গিয়েও তারা গ্রহণযোগ্য, সম্মানিত ও প্রভাবশালী। বাংলাদেশের জন্য বাস্তব শিক্ষা বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন, ইতিহাস ভিন্ন। তবুও কিছু মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব।
প্রথমত, প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির ঊর্ধ্বে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন—এগুলো দলনিরপেক্ষভাবে কার্যকর না হলে কোনো গণতন্ত্র টেকসই হয় না।
দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার মেয়াদ সীমিত—এই মানসিকতা জরুরি নির্বাচনে হার মানা গণতন্ত্রের ব্যর্থতা নয়; বরং এর সৌন্দর্য।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়ে সম্পদ আহরণ নয়
রাজনীতি ও ব্যক্তিগত ব্যবসার স্পষ্ট বিভাজন থাকতে হবে।
চতুর্থত, বিরোধী দল রাষ্ট্রের শত্রু নয় সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলই জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
পঞ্চমত, নীতির ধারাবাহিকতা অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—এগুলো দলীয় নয়, জাতীয় বিষয়। যা অনুকরণ করা যাবে না। আমেরিকার মতো স্লোগান নিয়ে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতন্ত্র চলবে না। ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতি, প্রতিহিংসামূলক মামলা, ক্ষমতার চিরস্থায়িত্ব—এসব রাষ্ট্রকে দুর্বল করে।
উপসংহার একজন মহান নেতা সেই নন যিনি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকেন,বরং তিনি সেই নেতা—
যিনি ক্ষমতা ছাড়ার পরও সম্মান হারান না।
বাংলাদেশ যদি উন্নত, স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হতে চায়, তবে নেতৃত্বের নৈতিকতা, ক্ষমতার সীমা ও আইনের শাসনকে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে।
রাষ্ট্র বাঁচে সিস্টেমে,
ব্যক্তিতে নয়।
লেখক: মোহাম্মদ আরিফ হোসাইন, কলামিস্ট,সচেতন নাগরিক সমাজ বাংলাদেশ।
Leave a Reply